মনের উপর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের দশরকম প্রভাব

ইন্টেরিয়র এনভায়ারনমেন্ট আপনার মন ভালো বা খারাপ রাখতে পারে– ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের এই বক্তব্যের পেছনে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। এমনকি ইন্টেরিয়র ডিজাইন সাইকোলজি নামে বিজ্ঞানের আলাদা একটি শাখাই আছে। যা নিয়ে কাজ করেছেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো সাইকোঅ্যানালিস্ট, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতো দার্শনিক কিংবা জন বি. ক্যালহানের মতো বিহেভিয়ারাল রিসার্চার।

চলুন মনের উপর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের দশটা চমৎকার প্রভাব দেখে নিই-

 

১০. ইন্টেরিয়র ডিজাইন আপনার একেবারেই পার্সনাল বিষয়

In-art Studio interior design it's very much personal

বাসা কিংবা অফিসের ভেতরের পরিবেশ পুরোপুরি আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে প্রথমত বাড়িতে দ্বিতীয়ত অফিসে। এই পরিবেশের ভেতরে থাকতে থাকতে ঘরের দেয়াল, দরজা কিংবা আসবাবের সাথে যেন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। মনে করে দেখুন তো কোন আসবাবপত্র বদলানোর পরে সেই ফার্নিচারকে মিস করেছেন কিনা। কিংবা অফিস চেঞ্জ করলে আগের অফিসের রুমটা মিস করেছেন কিনা? মিস করাটাই স্বাভাবিক। কেননা, পারিপার্শের প্রতিটা বস্তু আমাদের মনের উপর প্রভাব ফেলে। অনেকদিন ব্যবহারে পার্সনাল জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপান্তরিত হয়।

 

৯. মনের উপর রংয়ের প্রভাব

In-art Studio interior design effects of colour

ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রধান বিষয়গুলোর একটি হলো রং। ঘরে কিংবা বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, চারপাশের রং আপনার চোখে প্রথমে ধরা দিবে। সবুজ মাঠ কিংবা নীল আকাশের কথা চিন্তা করুন, ভাবতেই ভালো লাগে, তাই না? ঠিক একইভাবে ইন্টেরিয়র এনভায়ারনমেন্টকে পারফেক্ট করতে রংয়ের ভূমিকা অনেক অনেক অনেক বেশি।

যেমন, দেয়ালে কালো রং করা একটা মডার্ন কফিশপে বসে কফি খেতে আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু এই ড্রামাটিক রং যদি বেডরুমের দেয়ালে করা হয় তাহলে মোটেও তা ঘুমের জন্য ভালো হবে না। কালার সাইকোলজি সাইকোলজির অনেক সমৃদ্ধ একটা শাখা। এবং রং নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে যা প্রমাণ করে রংয়ের প্রভাব মনের উপর ব্যাপক। যেমন এই গবেষণায় দেখা গেছে, রেলস্টেশনে নীল আলো ব্যবহার করায় সেখানে আত্মহত্যার পরিমাণ কমে যায়! আর এটা তো সবাই জানে, মেয়েরা একটু উষ্ণ রং যেমন কমলা, লাল, গোলাপি আর ছেলেরা শীতল ধরণের রং যেমন নীল, সাদা বেশি পছন্দ করে।

 

৮. দুজনের মধ্যে দূরত্ব কিংবা স্পেইসের প্রভাব

In-art Studio interior design effects of space

পারসেপশন অব স্পেইস ইন্টেরিয়র ডিজাইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাসা কিংবা অফিসের মধ্যে দুজন মানুষের দূরত্ব কত হবে তার উপর তাদের মানসিকতার একটা বড় অংশ নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দূরত্ব যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হয় তাহলে তা ডিপ্রেশন, অবসাদ এমনকি ভায়োলেন্স ঘটাতে পারে। আমাদের ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের যে যেকোন যায়গায় বাসা বা অফিসের অ্যাভারেজ সাইজ প্রয়োজনের তুলনায় ছোট থাকে। যা আমাদেরকে মানসিকভাবে এমনকি অনেকসময় শারিরিকভাবে অসুখি করে তোলে।

তাই ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের লক্ষ্য থাকে প্রতিটা ফার্নিচারের মধ্যে এবং ফার্নিচারের সাথে দেয়ালের মধ্যে সঠিক হিসেব করে দূরত্ব ঠিক করা।

 

৭. মনের উপর উচ্চতার প্রভাব

In-art Studio interior design effects of height

ঘরের উচ্চতা, অফিসের উচ্চতা, শপিংমলের উচ্চতা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উচ্চতা কি এক? খেয়াল করে দেখবেন প্রতিটা যায়গায় রুমের উচ্চতা আলাদা আলাদা। ইন্টেরিয়র হাইট যত বেশি হবে, পরিবেশ তত খোলামেলা মনে হবে। কমলাপুর রেলস্টেশনের কথা চিন্তা করুন, হাইটের কারণে যায়গাটা খুবই সোস্যাল আর ওয়েলকামিং মনে হয়। শপিংমলগুলোর ছাদ এ জন্যই অনেক উচুতে থাকে। হাইট একই সাথে পাওয়ার শো করে। পুরানো দিনের জমিদারদের বাড়ি দেখবেন কত উচু উচু। আবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাদ উচুতে থাকার কারণে যায়গাটার ক্ষমতা আরও বেশি অনুভূত হয়।

ইন্টেরিয়র ডিজাইনার রং এবং টেক্সচারের ব্যবহারের মাধ্যমে আপনার ঘরের পারসিভড উচ্চতা কিছুটা বদলে দিতে পারে। তাতে দেয়ালগুলোকে উচু উচু আর সিলিং আরও উচুতে আছে বলে মনে হয়।

 

৬. মনের উপর ন্যাচারাল লাইটের প্রভাব

In-art Studio interior design effects of natural light

আপনার ঘরে কিংবা অফিসে ন্যাচারাল লাইট কতটুকু প্রবেশ করছে তার উপর যে মুড আর প্রডাক্টিভিটি নির্ভর করছে তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যাচারাল লাইট বেশি থাকার কারণে দোকানে বিক্রি বেশি হয়। আমরা যতই আর্টিফিসিয়াল লাইট ব্যবহার করি না কেন, ন্যাচারাল লাইটের ভূমিকা অন্য কোন লাইট পালন করতে পারে না।

এদিক থেকে বাংলাদেশের মানুষ আমরা সৌভাগ্যবান যে প্রাকৃতিক আলোর আমাদের কোন অভাব নেই, কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় আমরা সেই আলোর সঠিক ব্যবহার করছি না। সানলাইটের অভাব আমাদের বিষন্ন করে রাখে। শীতপ্রধান দেশগুলোতে ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার অন্যতম প্রধান কারণ এটি। তাই আপনার বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার সময় খেয়াল করুন সর্বোচ্চ ন্যাচারাল লাইট রুমে প্রবেশ করছে কিনা।

 

৫. ইন্টেরিয়র এনভায়ারনমেন্টে ন্যাচারাল এলিমেন্টের ব্যবহার

In-art Studio interior design using natural elements

ন্যাচারাল এলিমেন্ট বলতে বুঝায় গাছ, ফুল, পাথর, মাছ, পাখি কিংবা প্রকৃতি থেকে পাওয়া অন্য যে কোন উপাদান। এই গবেষণায় দেখা গেছে ইনডোর প্লান্ট ইন্টেরিয়র এনভায়ারনমেন্টকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে এবং স্ট্রেস কমায়। আমাদের দেশের ইন্টেরিয়রে এখন অনেক ন্যাচারাল এলিমেন্টের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। একুরিয়ামে মাছ কিংবা খাচায় পাখি অনেক আগ থেকেই আমরা পুষি। আর কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনস্ দ্বীপ থেকে আনা কোরাল বা ঝিনুক কিংবা জাফলং থেকে আনা সুন্দর পাথর ঘরে প্রায় সবাই সাজিয়ে রাখি। এই শহুরে যান্ত্রিক জীবনে ইন্টেরিয়র এনভায়ারনমেন্টে যতবেশি ন্যাচারাল এলিমেন্ট ব্যবহার করা যাবে, তত প্রশান্তি এবং প্রকৃতির অভাব কিছুটা হলেও দূর কর সম্ভব।

 

৪. মনের উপর ম্যাটারিয়েলের প্রভাব

In-art Studio interior design effect of materials

ঘরের ভেতর বিভিন্ন রকম ম্যাটারিয়েল ব্যবহার করতে হয়। লোহা, কাঠ, স্টেইনলেস স্টিল, কাঁচ কিংবা প্লাস্টিক। একেক ম্যাটারিয়েল একেক রকম ফিলিং নিয়ে আসে। লোহা বা স্টিল স্ট্রেংথ শো করে। লোহার দরজা কিংবা সিড়িতে আমরা অনেক সিকিউর ফিল করি। কাঠ ন্যাচারাল অনুভূতি নিয়ে আসে। খুব ন্যাচারাল পরিবেশে বনের মধ্যে লেকের পাশে একটা বাড়ির কথা চিন্তা করুন, চোখে যে বাড়িটা ভেসে আসবে তার সবকিছু যেন কাঠ দিয়ে বানানো। আর কাঁচ অ্যাস্থেটিক ভ্যালু বাড়ায়। কাঁচের দেয়াল আলো প্রবেশের জন্য ভালো। কিন্তু ঘরে বেশি কাঁচের ব্যবহার ঘরকে গরম করে রাখে। শীতপ্রধান দেশে কাঁচের ব্যবহার এজন্যই এতো বেশি। আমাদের দেশে অনেকে না বুঝেই কাঁচের অতিরিক্ত ব্যবহার করে বাতাস চলাচল বন্ধ করে ঘরকে গরম করে তুলে। একজন প্রকৃত আর্কিটেক্ট বা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার উন্নত দেশকে ফলো করে নয়, বরং এ দেশের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ম্যাটারিয়েল বাছাই করেন।

 

৩. মনের উপর টেক্সচারের প্রভাব

In-art Studio interior design texture

ঘরের ভেতরে টেক্সচারের সঠিক ব্যবহার সঠিক রঙের মতই গুরুত্বপূর্ন। আপনার দেয়াল, আপনার টেবিলটপ, সিড়ি, মেঝে কিংবা সোফা, কোথায় কি টেক্সচার ব্যবহার করছেন তা সবসময় আপনার সেন্সে ধরা পরছে। সঠিক টেক্সচার স্পর্শ করলে আমাদের ভালো লাগে। চিন্তা করে দেখুন তো, সিড়ির পাশে যে রেলিংয়ে আমরা হাত রাখি তা কতরকম হতে পারে? নিশ্চিতভাবেই আপনার মনে আছে, কোন সিড়ির রেলিংয়ে হাত রাখতে ভালো লেগেছিলো আর কোন সিড়িতে ভালো লাগে নি? ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের কাজ আপনার চারপাশের টেক্সচার এমনভাবে সিলেক্ট করা যার স্পর্শ সুখানুভূতি নিয়ে আসে।

 

২. বাতাস চলাচল মন প্রফুল্ল রাখে

In-art Studio interior design air flow

ঘরের ভেতরে ন্যাচারাল লাইট যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি দরকার বাতাস চলাচল। বাতাস চলাচল মন ভালো রাখে এবং অক্সিজেন সাপ্লাই ঠিক রাখে। বাসা কিংবা অফিস যেখানেই হোক, বাতাস চলাচলে বিঘ্নতা থাকলে বেশিক্ষণ কাজে মনোযোগ দেয়া কঠিন। কারণ অক্সিজেনের অভাব ব্রেইনে হাইপোক্সিয়া ঘটাতে পারে। যে কারণে ছোট, বন্ধ অফিসরুমে আপনার যে কলিগ আছে তাকে বেশি হাঁই তুলতে দেখবেন। ইন্টেরিয়র পরিবেশ তাই এমনভাবে সাজানো উচিত যাতে ম্যাক্সিমাম বাতাস ফ্লো করতে পারে। আর তা করার জন্য ইন্টেরিয়র ডিজাইনারকে ক্রস ভেন্টিলেশন, হাইব্রিড ভেন্টিলেশন এবং অন্যান্য প্যারামিটারগুলো ঠিকভাবে কাজে লাগছে কিনা নিশ্চিত হয়ে ডিজাইন করতে হয়।

 

১. আপনার নিজস্ব অ্যাস্থেটিক চাহিদা

In-art studio interior design aesthetic demand

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আপনার নিজের পছন্দ, রুচি। ডিজাইন যতই ফাংশনাল হোক না কেন, তা যদি আপনার অ্যাস্থেটিক ডিমান্ড পূরণ না করে তাহলে সম্পূর্ণই বৃথা। আপনার পছন্দের রং কি নিউট্রাল নাকি ওয়ার্ম? কোন ধরণের এনভায়ারণমেন্টে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, ক্ল্যাসিক নাকি মডার্ন? এই পছন্দগুলো উপরের ফাংশনালিটিগুলোর সাথে যখন পারফেক্টলি ম্যাচ করবে তখনই ইন্টেরিয়র ডিজাইন আপনাকে Inner Peace –এর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আপনার কেমন ধরণের ইন্টেরিয়র ডিজাইন পছন্দ? কোন ধরণের রং পছন্দ? কাঁচ, কাঠ কিংবা স্টেইনলেস স্টিল, কোন ধরণের ম্যাটারিয়েল পছন্দ? কমেন্টে তুলে ধরুন আপনার স্বপ্নের বাড়ি কিংবা অফিসের পরিবেশ।

Earn your INNER PEACE

In-art Studio

By | 2018-04-19T18:21:01+00:00 April 19th, 2018|Interior design|0 Comments

Leave A Comment